শুক্রবার, ৭ জুলাই, ২০১৭

মায়ারাগ

আঁখ-মরপর্ক শহরের দ্বিখন্ডিত শরীর জুড়ে আগুন গর্জে চলেছে। জাদুকরপাড়ায় যেখানে আগুনের স্পর্শ লেগেছে সেখানে নীল সবুজ রঙের শিখার পাশাপাশি অষ্টম রঙ মায়ারাগের ফুলকি ছিটে উঠছে। ওদিকে বণিক সরণিতে তেল আর আর চর্বির গুদামগুলোয় জ্বলন্ত ফোয়ারা আর বিস্ফোরণের সারি সৃষ্টি করে এগোচ্ছে আগুন। আতর মহল্লায় আগুন ছড়িয়েছে মিষ্টি গন্ধ আর জড়িবুটির দোকানে দুষ্প্রাপ্য সব গাছ গাছড়ায় লাগা আগুনের ধোয়ায় মানুষ বেতাল হয়ে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আলাপ জুড়েছে।

এর মধ্যেই শহরতলি মরপর্ক আগুনের লেলিহান শিখায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। নদীর অপর পারের সম্ভ্রান্ত এলাকা আঁখ এর ধনী  উচ্চশ্রেণির নাগরিকরা যথাযোগ্যভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করছেন, পাগলের মত কুপিয়ে নদীর উপরের সেতুগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে। কিন্তু ইতোমধ্যেই মরপর্ক বন্দরে নোঙর করে থাকা শস্য, কাপড়, কাঠ বোঝাই জাহাজগুলোতে আগুনের শিখা নাচতে আরম্ভ করেছে, জাহাজের কাছি বহু আগেই পুড়ে ছাই, সুতরাং মৃদু বাতাসে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে নদীর অপর পারের বাসিন্দাদের খাস গুলবাগিচা আর গোপন শস্যাগারে আগুন লাগিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিদূত হয়ে  ভাটার টানে আঁখ নদী বেয়ে সেগুলো ভেসে চলেছে ডুবন্ত জোনাকি পোকার মত।

সুগন্ধি গোলাপ থেকে কালো স্তম্ভের মত ধোয়া উঠছে আকাশ সমান উচ্চতায়,  চক্রধাম এর যেকোন প্রান্ত থেকেই যা চোখে পড়বে।

ক্রোশখানেক দূরে এক  শীতল অন্ধকার পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এই চিত্তাকর্ষক দৃশ্য আগ্রহ নিয়ে দেখছিলো দুটি অবয়ব। অপেক্ষাকৃত দীর্ঘদেহী অবয়বটি এক মানুষ সমান লম্বা একটি তরবারিতে হেলান দিয়ে মুরগির ঠ্যাং চিবোচ্ছিল।  তার সতর্ক চাহনিতে বুদ্ধিমত্তার ছাপটুকু বাদ দিলে তাকে দিব্যি কেন্দ্রের ভাগাড়ের কোন এক বর্বর বলে চালিয়ে দেয়া যাবে।

তার সঙ্গী গত বিশ মিনিটে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। কিছুক্ষণ আগের বিশাল বিস্ফোরণটা  কোন তেলের বন্ধকি দোকান না কাবিল কুহক এর কারখানাতে হলো এ নিয়ে তাদের মাঝে একখানা সংক্ষিপ্ত উপসংহারবিহীন বাদানুবাদ হয়েছে। টাকাপয়সার ব্যপার জড়িত আছে এতে।


" ঐ গেলো সব কানাগলিগুলো", বৃহদকায় মানুষটি চিবিয়ে ছিবড়ে করে ফেলা হাড্ডিটা ঘাসে ছুড়ে ফেলে তিক্ত হেসে বললো, " জায়গাটা ভালো পেতাম।"

" সব রত্নভান্ডারগুলো", ক্ষুদ্রকায়া একটু ভেবে যোগ করলো, " হীরে জহরত কি আগুনে পোড়ে? আমি তো শুনেছি হীরে নাকি কয়লার মতন।"

"সব সোনা গলে গলে নর্দমায় ভেসে গেলো," ক্ষুদ্রাকায়াকে উপেক্ষা করে বলে চললো বৃহৎ, " আর সব মদ, টগবগ করে ফুটছে পিপের মধ্যে।"

" ইঁদুর ছিলো অনেক", বললো তার বাদামী চামড়ার সঙ্গী।
" ইঁদুর জ্বালাতো বড্ড!"
"এই বিচ্ছিরি গরমে থাকার মত কোন জায়গা ছিলো না ঐ শহরটা"
" তাও কথা। তবু, কেমন যেন... মন কেমন কেমন...", বাক্যের শেষটা শোনা গেলো না। কথা ঘুরিয়ে ফেললো বিশাল দেহ, " লাল রক্তচোষার বুড়ো ফ্রেডর এর আমাদের কাছে আট রুপা পেতো!" ছোট্ট ব্যক্তিটি মাথা নেড়ে সায় দিলো।

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শহর এর এতবদবধি অন্ধকার এক অংশে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শব্দের সাথে সাথে লাল-হলুদ আগুনে নদী সৃষ্টি হওয়ার দৃশ্য তাদের কথোপকথনে বাধ সাধলো। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে নড়েচড়ে উঠে বিশাল দেহ ডাকলো,

" নকুল?"
" হ্যা?"
" আগুনটা লাগালো কে বলো তো?"

নকুল নামের বেটে তলোয়ারধারী কিছু বললো না। আবছা আলোয় সে শহর থেকে বেরিয়ে আসা পথের দিকে দেখছিলো। ডেওসিল তোরণখানি জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে খসে পড়ার পর থেকে ও পথে খুব কমই শহর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ও পথ ধরে দুজন এখন এগিয়ে আসছে। আবছা আধারে সবচেয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টির অধিকারী নকুল দুজন অশ্বারোহী আর তাদের পিছে কোন একটা জন্তুর অবয়ব চিহ্নিত করতে পারলো। নিশ্চয়ই কোন ধনী বণিক হাতের কাছে যা ধনরত্ন পেয়েছে নিয়ে পালাচ্ছে। নকুল তার সঙ্গীকে তার ভাবনা জানালে সে ছোট করে শ্বাস ফেললো।

"পথিকের বেশ আমাদের মানায় না," বিশালদেহী বর্বর মত দিলো, " আর সময়টাও ভালো যাচ্ছে না, আজ রাতে কোথাও নরম বিছানা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।"

প্রথম অশ্বারোহী ততক্ষণে কাছে এসে ঘোড়া থেকে রাস্তায় নেমে পড়েছে, এক হাত উঁচু আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে, মুখে অভয়সূচক কিন্তু ভয়ানক মাপা হাসি। তলোয়ারের হাতলটা চেপে ধরে বিশালদেহী মুখ খুললো, " মাফ করবেন জনাব..."

অশ্বারোহী তার ঘোড়া বেধে মাথার ঢাকনা সরালো। এখানে সেখানো পোড়া চামড়া আর ছাই হওয়া দাড়িতে ঢাকা একটা মুখ দেখা গেলো। ভুরুজোড়া পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন সেখানে।

" দূর হও!" বলে উঠলো মুখটা, " তুমি হলে অভীক মধ্যমপুরী, তাই না?"

অভীক টের পেলো, ডাকাতির উদ্যোগটা সে গুবলেট করে ফেলেছে।

" দূরে গিয়ে মুড়ি খাও, যাওগে।" বললো অশ্বারোহী, " আমার সময় নেই তোমার সঙ্গে গেঞ্জাম করার, বুঝেছ?" চারপাশে তাকিয়ে সে যোগ করলো, "  আধারে ঘাপটি মেরে থাকা তোমার সঙ্গী ছারপোকার গুষ্টির জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। "

নকুল ছায়া থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার কাছে দাঁড়িয়ে বিধ্বস্ত আরোহীর দিকে ভালো করে তাকালো।

" আরে, এযে দেখছি ফুরফুরা জাদুকর, তাই না?" কৌতুকের সুরে বললো সে, কিন্তু জাদুকরের চেহারাটা ভালো করে মনে গেঁথে নিলো অবসরে প্রতিশোধের পরিকল্পনা করার সুবিধার্থে, "গলা শুনেই চিনেছি।"

অভীক থুথু ফেলে তলোয়ার খাপে ঢোকালো। জাদুকরদের সাথে জোরাজুরি করে খুব একটা লাভ নেই, এদের কাছে কখনোই উল্লেখযোগ্য কোন সম্পদ থাকেনা।

"কোথাকার কোন নর্দমার জাদুকর, খালি বড় বড় কথা!", গজগজ করলো সে।

"তুমি বুঝ নাই", জাদুকর ক্লান্তভাবে বললো, "আগুনের বিভীষিকায় আমি এমন ভয় পেয়েছি, যে আমার  মেরুদন্ড গলে হালুয়া হয়ে গেছে, ভয়ের চোটে উল্টোপাল্টা বকছি। মানে, প্রাথমিক ভয়ের ধকলটা কাটিয়ে উঠতে পারলে, তোমাকে দেখে ঠিকঠাক মত ভয় পেতে পাবো।"

নকুল জ্বলন্ত শহরের দিকে আঙ্গুল তুলে জিজ্ঞেস করলো, " ওর ভেতর দিয়ে এসেছ তোমরা?"

পুড়ে লাল হওয়া হাতটা তুলে বললে জাদুকর, " আগুন লাগার সময় আমি ওখানে ছিলাম। ওকে দেখেছ? ঐ যে পিছে পিছে আসছে?"  হাচড়ে পাচড়ে ঘোড়ার পিঠে ঝুলে থাকতে মরিয়া অগ্রসরমান সঙ্গীকে দেখালো সে।
"হু, দেখছি।" বললো নকুল।
" ঐ লাগিয়েছে আগুন।" ছোট্ট করে বললো ফুরফুরা।







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন