শুক্রবার, ৪ আগস্ট, ২০১৭

চক্রধামাঃ মায়ারাগ (চলছে...) পর্ব-৫

এই ঘটনার কিছুদিন আগে কোন এক ভোরে আখ নদী বেয়ে একটা জাহাজ এসে মরপর্ক বন্দরের ঘোরপ্যাচওয়ালা অসংখ্য ঘাটের কোন একটায় নোঙর ফেলে। জাহাজের খোলে করে এসেছিলো গোলাপী মুক্তো, দুধবাদাম, ঝামা, এর নগরপিতার জন্য কিছু দাপ্তরিক চিঠিপত্র আঁখ  এবং একজন মানুষ।

এই মানুষটিই কানা হারুন এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কানা হারুন মুক্তাঘাট এ সকাল সকাল ভিক্ষা করতে হাজির হয়েছিলো। সে ল্যাংড়া ওয়াসিমের পাঁজরে গুতো দিয়ে নীরবে নির্দেশ করলো মানুষটির দিকে।

নবাগত বিদেশী ঘাটপারে দাঁড়িয়ে ঘর্মাক্ত খালাসীদের বিশাল পিতল মোড়া একটা সিন্দুক নামিয়ে আনা লক্ষ্য করছিলো। অপর একজন মানুষ, নিঃসন্দেহে কাপ্তান, তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। হারুন কানা হলে কি হবে, পঞ্চাশ পা এর মাঝে এক চিমটে সোনা থাকলেও তার অতীন্দ্রিয়তে ধরা পরে, তাই খালাসীদের ঘিরে হঠাৎ বড়লোক বনে যাবার তিরতিরে হাওয়াটা ঠিকই টের পাচ্ছিলো। তার ধারণা এক্কেবারে সঠিক ছিলো, কারণ সিন্দুকখানি রাজপথে নামানো মাত্রই নবাগত তার থলে খুললে ভেতর থেকে ধাতব মুদ্রার ঝিলিক দেখা গেল। অনেকগুলো মুদ্রা। স্বর্ণের। কানা হারুন এর শরীর জালি বেতের মত শপাং করে সোজা হয়ে গেলো, একটা শিষও বের হয়ে এলো ঠোঁট থেকে। ল্যাংড়া ওয়াসিমকে আরেকখানা ঠ্যালা দিলে, সে উঠে সুড়সুড় করে পাশের এক গলি ধরে শহরের প্রানকেন্দ্রের উদ্দেশ্য রওনা দিলো।

কাপ্তান জাহাজে উঠে বিদায় নিলে পরে ভিক্ষার পাত্র হাতে নিয়ে রাস্তার ঐপারে ঘাটের পাশে দাঁড়ানো দাঁড়ানো বিমূঢ় আগন্তকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো কানা হারুন, মুখে লোভী দৃষ্টি। তাকে দেখা মাত্র নবাগত তাড়াহুড়ো করে তার টাকার থলিতে হাত ঢোকালো।

"আপনের দিনটা ভালো যাইবো, স্যার।" বলতে বলতে কানা হারুন ভালো করে আগন্তকের দিকে তাকালো। চার চোখ ওয়ালা একটা মুখ দেখে উলটো দৌড় দেবে এমন সময় আগন্তক তার হাত চেপে ধরলো, এবং বললো, "!" হারুন টের পেলো খালাসীরা জাহাজের রেলিং এ দাঁড়িয়ে তাকে দেখে হাসছে, কিন্তু একই সাথে তার অতীন্দ্রিয় টেকাটুকার যে আভাস দিচ্ছে তাও অস্বীকার করতে পারলো না। সে জমে গেলো সেখানে ছিলো সেখানেই। আগন্তক তার হাত ছেড়ে দিয়ে কোমরবন্ধনী থেকে বের করে আনা ছোট একটা কালো বই এর পাতা দ্রুত গতিতে উলটে এক পাতায় এসে থামলো। তারপর বললো, " হ্যালো।"

"কি?" জিজ্ঞেস করে শূণ্য দৃষ্টি উত্তর পেলো হারুন।
" হ্যালো?" নবাগত পুনরায় বলো, আগের চেয়ে উচ্চস্বরে এবং এতটাই সাবধানতা সহকারে, যে হারুন যেন আ-কার ও-কার গুলো ঝুলে থাকার টিং টিং শব্দ শুনতে পেলো।

" আপনারেও হ্যালো" হারুন কোনমক্রমে উত্তর দিলো। এবার নবাগত চওড়া হাসি দিয়ে আবার তার থলে হাতড়াতে লাগলো এবং অবশেষে একটা বিশালাকৃতি স্বর্ণমুদ্রা বের করে আনলো। মুদ্রাখানি আকৃতিতে আঁখ এর ৮০০০ আনা এর মুদ্রার চেয়ে একটু বড়, নকশা দেখে এর তুল্য মান ধারণা করতে না পারলেও মুদ্রার ভাষাখানি বুঝতে হারুনের কোনই অসুবিধা হলো না। মুদ্রাটি বলছে, আমার  বর্তমান মালিকের একটু সাহায্য সহযোগিতা দরকার, তুমি যদি তা দিতে পারো, তাহলে তুমি আর আমি মিলে কোথাও গিয়ে একটু ফুর্তি টুর্তি করতে পারি।

ভিক্ষুকের ভাবভঙ্গিতে সূক্ষ্ণ পরিবর্তন আগন্তককের মনে আশা জাগালো। সে আবার বই এর পাতা উলটে বললো,
" আমি যেতে চাই একটি হোটেল, সরাইখানা, শুঁড়িখানা, বাসস্থান, পান্থশালা, পানশালা, ধর্মশালা।"
" কীইই! সবগুলাতে যাইতে চান?", হারুন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো।
"??" বললো আগন্তক।
হারুনের খেয়াল হলে তাদের ঘিরে এর মধ্যেই জেলেনী, ঝিনুক কুড়োনী আর অকম্মা মজা দেখা লোকজনের ছোট একটা জটলা তৈরি হতে শুরু করেছে।  কাজেই স্বর্ণমুদ্রাখানি তার হাতছাড়া হবার আশংকায় তাড়াতাড়ি বললো, " দেখো। আমার চেনা একটা ভালো শুঁড়িখানা আছে, চলবে?" সে অন্তত ঐ একখানা স্বর্ণমুদ্রা চায়, বাকিগুলো জমির খাঁ মেরে দিলে দিক। তাছাড়া ঐ আগন্তকের সাথের ঐ বিশাল সিন্দুকখানাতেও ভালোই সোনাদান আছে, আন্দাজ করলো হারুন।

চার-চোখো আবার তার বই এর দিকে তাকিয়ে বললো, "আমি যেতে চাই একটি সরাইখানা, বিশ্রামের জায়গা, শুঁড়িখানা..."
" হ্যা হ্যা, উঝেছি। চলেন আমার সাথে", হারুন তাড়াতাড়ি একটা বোচকা তুলে রওনা দিলো। এক মূহুর্ত ইতস্তত করে আগন্তকও তার পিছে রওনা হলো। হারুনের মাথার ভিতরে দ্রুত অনেকগুলো চিন্তা খেলে গেলো। তার কপাল আজকে ভালো ছিলো, যে নবাগতকে এত সহজে ঢোলভাঙা তে যেতে রাজি করানো গেলো। জমির ব্যাপারীর থেকে কিছু বখশিশ তো মিলবে। তার নতুন বন্ধুটি নরম সরম মনে হলেও কেন যে তার মনের ভিতর খুতখুত করছে, কিছুতেই বের করতে পারলো। মুখের সামনে চ্যাপ্টা স্বচ্ছ দুটো বাড়তি চোখ দেখতে অদ্ভুত লাগলেও অস্বস্তিটা সেজন্য নয়। সে আবার পিছে তাকালো।

ছোটখাট মানুষটা রাস্তার মাঝ বরাবর দুলকি চালে হাটছে, আশেপাশের সবকিছু অতি আগ্রহ নিয়ে দেখতে দেখতে। কিন্তু তার পিছেই যা দেখলো তাতে হারুনের খাবি খাবার উপক্রম হলো। একটু আগেও ঘাটপারে পড়ে থাকা বিশাল কাঠের সিন্দুকখানা তার মনিবের সাথে তাল মিলিয়ে হেলেদুলে এগোচ্ছে। খুব ধীরে, নিজের হাটুর কাঁপুনি সামলে হারুন আস্তে করে উবু হয়ে সিন্দুকের নিচে উঁকি দিলো।

অনেক, অনেকগুলো ছোট ছোট পা সিন্দুক থেকে বেরিয়ে ছন্দে ছন্দে পা মিলিয়ে চলেছে।

ঝট করে সোজা হয়ে উলটো ঘুরে হারুন ঢোলভাঙা-র দিকে হাঁটা দিলো।





মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই, ২০১৭

চক্রধামাঃ মায়ারাগ (চলছে...) পর্ব-৪

অভীক আর নকুল এবার ভালো করে তাকালো ছায়ামূর্তির দিকে, এক পা ঘোড়ার রেকাবে আটকানো, অপর পা রাস্তা ধরে লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছে।
"অগ্নিমূর্তি, হ্যাহ!?", অবশেষে মন্তব্য করলো অভীক।
" না।" বললো ফুরফুরা, "মানে, আসলে কি বলবো। এ হলো এমন লোক যে ঠাডা পড়া কি সেই কৌতুহল মেটাতে, ঝড় বৃষ্টির রাতে মাথায় তামার শিরোস্ত্রাণ চাপিয়ে কোন পাহাড়ের মাথায় খোদাতালাকে গালি গালাজ করতে রওনা হবে। ইয়ে, তোমাদের কাছে কোন খাবার হবে?"

" মুরগি আছে একটু।" বললো নকুল, "যদি তোমাদের কাহিনী খুলে বলো।"

" ও ব্যাটার নাম কি?" জিজ্ঞেস করলো অভীক, কথোপকথন চালিয়ে যাবার ব্যাপার সে একটু ঢিলে।

"দুকুঁড়ি।"

" দুই কুঁড়ি?" অভীক নিশ্চিত হতে চাইলো, " কি অদ্ভুত নাম রে বাবা।"

"বৎস", বললো ফুরফুরা, "অদ্ভুতের দেখেছ কি। মুরগি হবে বললে?"

" আগুনের মত ঝাল দিয়ে রাঁধা" জানালো নকুল। জাদুকর মুখ বাঁকালো।

" আগুনের কথায় মনে পড়লো" দু আঙ্গুলে তুড়ি বাজিয়ে জিজ্ঞেস করলো নকুল, "ওখানে বিশাল একটা বিস্ফোরণ দেখেছি আমরা, এই ধরো আধ ঘন্টাটাক আগে..."

"তেলী বন্ধকি দোকানটা উড়ে গেছে তখন" জানালো ফুরফুরা, আগুনের ফুলকি বৃষ্টির স্মৃতি স্মরণ করে একটু কুকড়ে গেলো সে।

নকুল দেঁতো হাসি দিয়ে তার সঙ্গীর দিকে ফিরলে কিছু গজগজানির সাথে থলে থেকে একটা মুদ্রাও হাত বদল হলো। এসময় রাস্তা থেকে একটা চিৎকারের শব্দ শুরু হয়ে হঠাৎ থেমে গেলো। ফুরফুরা মুরগি চিবোনো থেকে চোখ না উঠিয়েই বললো,

"ও ব্যাটা যা যা পারে না, ঘোড়ায় চড়া তার মধ্যে একটা মাত্র।"

বলামাত্রই সে হঠাৎ শক্ত হয়ে গেলো, যেন বালির বাধ ভেঙ্গে পরার মত কিছু একটা তার মনে পড়েছে, তারপর একটা ছোট আর্তচিৎকার ছেড়ে অন্ধকারে ছায়ামূর্তিটির দিকে ছুটে গেলো। যখন সে ফিরে ফেলো, তখন তার কাঁধে দুকুঁড়ি নামের ব্যক্তিটির দেহ ঝুলছে। ছোটখাট প্যাকাটি শরীরে একখানি হাফপ্যান্ট পরা, উর্ধাঙ্গের পিরানখানিতে এমন উজ্জ্বল আর জঘন্য সব রঙের সমারোহ, যে এই আধো আলোতেও নকুলের চোখ ধাঁধিয়ে গেলো।

"টিপেটুপে দেখেছি, কোন হাড় ভাঙেনি।" দুকুঁড়ির শরীর পরীক্ষা করতে করতে জানালো ফুরফুরা, " এর উপর নির্ঘাত কোন নেয়ামত আছে।"

"কোন কিছুর আছর হয়েছে নাকি?" হাটু গেড়ে বসে বললো নকুল।

" আরে না না। কিন্তু কোন ধরনের ভূত মনে হয়। যেমন তেমন ঝাঁড় ফুক না। এই ভূত সোনাকে রুপান্তর করতে পারে তামাতে, অথচ সেটা দেখতে সোনার মতনই রয়ে যায়, এই ভূত  ধনীদেরকে প্রলুদ্ধ করে তাদের সয় সম্পত্তি সব বিকিয়ে দিতে, এর প্রভাবে ভীতুরা নির্ভীকভাবে চোর ডাকাতের মাঝে হেটে বেড়ায়, কঠিন দরজা ভেঙ্গে সমস্ত ধন রত্ন লুটে নিতে পারে এর শক্তি। এমনকি এই মূহুর্তেও এই ভূত আমারত উপর এমনভাবে ভর করেছে যে, আমাকে এই পাগলার পিছে পিছে ছুটতে হচ্ছে, সব বিপদ থেকে ব্যাটাকে বাঁচাতে হচ্ছে। এর শক্তি এই অভীক ব্যাটার থেকেও বেশি। নকুল, তোমার থেকেও এ অনেক বেশি ধূর্ত।"

"এই মহাপরাক্রমশালী ভুতের নাম কি হে?"

ফুরফুরা কাঁধ নাচালো, "আক্ষরিক অনুবাদ করলে পরে, 'লোলপড়ে যার অনিঃশেষ'*। মদ হবে তোমাদের কাছে?"

"তবে শুনে রাখো, জাদু ফাদু আমিও কিছু কম জানি না।" বললো নকুল, "এই তো গেলো বছরই তো, আমার এই বন্ধুটিকে সাথে নিয়ে, এক এক করে কেড়ে নিয়েছি যমপুরির জাদুকরপ্রধানের জাদুদন্ড, চন্দ্রমানিক খচিত কোমরবন্ধনী, এবং অব...ঠিক শেষে নয়, প্রথমে তার প্রাণপ্রদীপখানি। ঐ সব অবিরাম লোলপড়া ভূতের কথা আমায় শুনিয়ো না। ওসবে ডরাই না আমি। তবে তোমার গল্প শুনে বাকিটা শুনতে আমার ইচ্ছে করছে।"

অভীক রাস্তা ধরে কাছিয়ে আসা অবয়বটির দিকে তাকালো। যেভাবেই দেখা হোক না ভোরের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছিল -

"বাক্সটা হাটছে?"

"যদি কিছু মদ পেটে পড়ে ", বললো ফুরফুরা, " তাহলে ওটার সব কাহিনী বলতে পারি। "

ওদিকে পাহাড়ের উপত্যকায় শহর থেকে আগুনের গর্জন কমে ফোঁসফাঁসে পরিণত হয়েছে। নদীর পানি যেখানে সাগরে মিশে সেখানের বিশাল খালদ্বারগুলো কেউ বন্ধ করবার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে, যাবার জায়গা না পেয়ে নদী উছলে উঠে দুপাশের আগুনে পোড়া রাস্তা গুলো ছাপিয়ে চলেছে।ঘন কালো ঢেউ এর উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে খুব দ্রুত মহাদেশসম আগুনের বিস্তার ছোট ছোট দ্বীপে পরিণত হয়েছে। ধূম আর ধোঁয়া ছাড়িয়ে এখন শহরের উপরে আকাশ ছেয়ে গেছে বাষ্প আর মেঘে। নকুলের মনে হলো যেন শহরের উপর কালো একটা ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে।

গৌরবান্বিত আঁখ আর ফকিরা মরপর্ক মিলে যে যমজ শহর, যার আদলে ইতিহাসের আর সকল শহরের সৃষ্টি হয়েছে, যুগে যুগে এমন বহু বিপদ আপদ সে পাড়ি দিয়ে এসেছে, এবং প্রতিবারই ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং এই দাবানলে যা কিছু পুড়তে বাকি ছিলো, পরবর্তী বন্যাতে সে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও তা কেবল একটু বাড়তি উপদ্রব নিয়ে এসেছিলো বেঁচে যাওয়া অধিবাসীদের জন্য। কোনক্রমেই এ প্রলয় শহরের ইতিহাসে দাঁড়ি নয়, বড়োজোর একটা অগ্নুজ্জ্বল যতিচিহ্ন মাত্র, হয়তো কয়লা ঢাকা একটা কমাচিহ্ন বা সাপের মতন একখানা সেমিকোলন।


* জোক ব্যাখ্যা করে বলে দিলে সেটা আর জোক না থেকে কেঁচো হয়ে যায়। প্র্যাচেট লিখেছিলেন, " পাতাল্পুরীর বাসিন্দাদের থেকে আসা প্রতিধ্বনি" , ইংরেজিতে প্রতিধ্বনি= ইকো, পাতাল্পুরীর বাসিন্দা = নোম > নোমিক্স। বাংলায় শব্দ নিয়ে খেলে দাঁড়ালো,  লোল পড়ে যার = ওর থু, অনিঃশেষ = নেই ইতি > ওরথুনেইইতি = অর্থনীতি।

শুক্রবার, ৭ জুলাই, ২০১৭

মায়ারাগ

আঁখ-মরপর্ক শহরের দ্বিখন্ডিত শরীর জুড়ে আগুন গর্জে চলেছে। জাদুকরপাড়ায় যেখানে আগুনের স্পর্শ লেগেছে সেখানে নীল সবুজ রঙের শিখার পাশাপাশি অষ্টম রঙ মায়ারাগের ফুলকি ছিটে উঠছে। ওদিকে বণিক সরণিতে তেল আর আর চর্বির গুদামগুলোয় জ্বলন্ত ফোয়ারা আর বিস্ফোরণের সারি সৃষ্টি করে এগোচ্ছে আগুন। আতর মহল্লায় আগুন ছড়িয়েছে মিষ্টি গন্ধ আর জড়িবুটির দোকানে দুষ্প্রাপ্য সব গাছ গাছড়ায় লাগা আগুনের ধোয়ায় মানুষ বেতাল হয়ে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আলাপ জুড়েছে।

এর মধ্যেই শহরতলি মরপর্ক আগুনের লেলিহান শিখায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। নদীর অপর পারের সম্ভ্রান্ত এলাকা আঁখ এর ধনী  উচ্চশ্রেণির নাগরিকরা যথাযোগ্যভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করছেন, পাগলের মত কুপিয়ে নদীর উপরের সেতুগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে। কিন্তু ইতোমধ্যেই মরপর্ক বন্দরে নোঙর করে থাকা শস্য, কাপড়, কাঠ বোঝাই জাহাজগুলোতে আগুনের শিখা নাচতে আরম্ভ করেছে, জাহাজের কাছি বহু আগেই পুড়ে ছাই, সুতরাং মৃদু বাতাসে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে নদীর অপর পারের বাসিন্দাদের খাস গুলবাগিচা আর গোপন শস্যাগারে আগুন লাগিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিদূত হয়ে  ভাটার টানে আঁখ নদী বেয়ে সেগুলো ভেসে চলেছে ডুবন্ত জোনাকি পোকার মত।

সুগন্ধি গোলাপ থেকে কালো স্তম্ভের মত ধোয়া উঠছে আকাশ সমান উচ্চতায়,  চক্রধাম এর যেকোন প্রান্ত থেকেই যা চোখে পড়বে।

ক্রোশখানেক দূরে এক  শীতল অন্ধকার পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এই চিত্তাকর্ষক দৃশ্য আগ্রহ নিয়ে দেখছিলো দুটি অবয়ব। অপেক্ষাকৃত দীর্ঘদেহী অবয়বটি এক মানুষ সমান লম্বা একটি তরবারিতে হেলান দিয়ে মুরগির ঠ্যাং চিবোচ্ছিল।  তার সতর্ক চাহনিতে বুদ্ধিমত্তার ছাপটুকু বাদ দিলে তাকে দিব্যি কেন্দ্রের ভাগাড়ের কোন এক বর্বর বলে চালিয়ে দেয়া যাবে।

তার সঙ্গী গত বিশ মিনিটে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। কিছুক্ষণ আগের বিশাল বিস্ফোরণটা  কোন তেলের বন্ধকি দোকান না কাবিল কুহক এর কারখানাতে হলো এ নিয়ে তাদের মাঝে একখানা সংক্ষিপ্ত উপসংহারবিহীন বাদানুবাদ হয়েছে। টাকাপয়সার ব্যপার জড়িত আছে এতে।


" ঐ গেলো সব কানাগলিগুলো", বৃহদকায় মানুষটি চিবিয়ে ছিবড়ে করে ফেলা হাড্ডিটা ঘাসে ছুড়ে ফেলে তিক্ত হেসে বললো, " জায়গাটা ভালো পেতাম।"

" সব রত্নভান্ডারগুলো", ক্ষুদ্রকায়া একটু ভেবে যোগ করলো, " হীরে জহরত কি আগুনে পোড়ে? আমি তো শুনেছি হীরে নাকি কয়লার মতন।"

"সব সোনা গলে গলে নর্দমায় ভেসে গেলো," ক্ষুদ্রাকায়াকে উপেক্ষা করে বলে চললো বৃহৎ, " আর সব মদ, টগবগ করে ফুটছে পিপের মধ্যে।"

" ইঁদুর ছিলো অনেক", বললো তার বাদামী চামড়ার সঙ্গী।
" ইঁদুর জ্বালাতো বড্ড!"
"এই বিচ্ছিরি গরমে থাকার মত কোন জায়গা ছিলো না ঐ শহরটা"
" তাও কথা। তবু, কেমন যেন... মন কেমন কেমন...", বাক্যের শেষটা শোনা গেলো না। কথা ঘুরিয়ে ফেললো বিশাল দেহ, " লাল রক্তচোষার বুড়ো ফ্রেডর এর আমাদের কাছে আট রুপা পেতো!" ছোট্ট ব্যক্তিটি মাথা নেড়ে সায় দিলো।

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শহর এর এতবদবধি অন্ধকার এক অংশে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শব্দের সাথে সাথে লাল-হলুদ আগুনে নদী সৃষ্টি হওয়ার দৃশ্য তাদের কথোপকথনে বাধ সাধলো। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে নড়েচড়ে উঠে বিশাল দেহ ডাকলো,

" নকুল?"
" হ্যা?"
" আগুনটা লাগালো কে বলো তো?"

নকুল নামের বেটে তলোয়ারধারী কিছু বললো না। আবছা আলোয় সে শহর থেকে বেরিয়ে আসা পথের দিকে দেখছিলো। ডেওসিল তোরণখানি জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে খসে পড়ার পর থেকে ও পথে খুব কমই শহর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ও পথ ধরে দুজন এখন এগিয়ে আসছে। আবছা আধারে সবচেয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টির অধিকারী নকুল দুজন অশ্বারোহী আর তাদের পিছে কোন একটা জন্তুর অবয়ব চিহ্নিত করতে পারলো। নিশ্চয়ই কোন ধনী বণিক হাতের কাছে যা ধনরত্ন পেয়েছে নিয়ে পালাচ্ছে। নকুল তার সঙ্গীকে তার ভাবনা জানালে সে ছোট করে শ্বাস ফেললো।

"পথিকের বেশ আমাদের মানায় না," বিশালদেহী বর্বর মত দিলো, " আর সময়টাও ভালো যাচ্ছে না, আজ রাতে কোথাও নরম বিছানা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।"

প্রথম অশ্বারোহী ততক্ষণে কাছে এসে ঘোড়া থেকে রাস্তায় নেমে পড়েছে, এক হাত উঁচু আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে, মুখে অভয়সূচক কিন্তু ভয়ানক মাপা হাসি। তলোয়ারের হাতলটা চেপে ধরে বিশালদেহী মুখ খুললো, " মাফ করবেন জনাব..."

অশ্বারোহী তার ঘোড়া বেধে মাথার ঢাকনা সরালো। এখানে সেখানো পোড়া চামড়া আর ছাই হওয়া দাড়িতে ঢাকা একটা মুখ দেখা গেলো। ভুরুজোড়া পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন সেখানে।

" দূর হও!" বলে উঠলো মুখটা, " তুমি হলে অভীক মধ্যমপুরী, তাই না?"

অভীক টের পেলো, ডাকাতির উদ্যোগটা সে গুবলেট করে ফেলেছে।

" দূরে গিয়ে মুড়ি খাও, যাওগে।" বললো অশ্বারোহী, " আমার সময় নেই তোমার সঙ্গে গেঞ্জাম করার, বুঝেছ?" চারপাশে তাকিয়ে সে যোগ করলো, "  আধারে ঘাপটি মেরে থাকা তোমার সঙ্গী ছারপোকার গুষ্টির জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। "

নকুল ছায়া থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার কাছে দাঁড়িয়ে বিধ্বস্ত আরোহীর দিকে ভালো করে তাকালো।

" আরে, এযে দেখছি ফুরফুরা জাদুকর, তাই না?" কৌতুকের সুরে বললো সে, কিন্তু জাদুকরের চেহারাটা ভালো করে মনে গেঁথে নিলো অবসরে প্রতিশোধের পরিকল্পনা করার সুবিধার্থে, "গলা শুনেই চিনেছি।"

অভীক থুথু ফেলে তলোয়ার খাপে ঢোকালো। জাদুকরদের সাথে জোরাজুরি করে খুব একটা লাভ নেই, এদের কাছে কখনোই উল্লেখযোগ্য কোন সম্পদ থাকেনা।

"কোথাকার কোন নর্দমার জাদুকর, খালি বড় বড় কথা!", গজগজ করলো সে।

"তুমি বুঝ নাই", জাদুকর ক্লান্তভাবে বললো, "আগুনের বিভীষিকায় আমি এমন ভয় পেয়েছি, যে আমার  মেরুদন্ড গলে হালুয়া হয়ে গেছে, ভয়ের চোটে উল্টোপাল্টা বকছি। মানে, প্রাথমিক ভয়ের ধকলটা কাটিয়ে উঠতে পারলে, তোমাকে দেখে ঠিকঠাক মত ভয় পেতে পাবো।"

নকুল জ্বলন্ত শহরের দিকে আঙ্গুল তুলে জিজ্ঞেস করলো, " ওর ভেতর দিয়ে এসেছ তোমরা?"

পুড়ে লাল হওয়া হাতটা তুলে বললে জাদুকর, " আগুন লাগার সময় আমি ওখানে ছিলাম। ওকে দেখেছ? ঐ যে পিছে পিছে আসছে?"  হাচড়ে পাচড়ে ঘোড়ার পিঠে ঝুলে থাকতে মরিয়া অগ্রসরমান সঙ্গীকে দেখালো সে।
"হু, দেখছি।" বললো নকুল।
" ঐ লাগিয়েছে আগুন।" ছোট্ট করে বললো ফুরফুরা।







শুক্রবার, ৩০ জুন, ২০১৭

অষ্টযাত্রাঃ পূর্বরঙ্গ

চক্রাধামের সৌন্দর্য্য অন্যান্য যেকোন বিশ্বজগতের চেয়ে অনেক বেশি মনোমুগ্ধকর। বিশেষত সেইসব জগত যেগুলো দক্ষ কারিগর কিন্তু দরিদ্র কল্পনাশক্তি বিশিষ্ট সৃষ্টিকর্তাদের তৈরি। 

নিখুঁত কারিগরি কিন্তু দরিদ্র কল্পনাশক্তি বিশিষ্ট সৃষ্টিকর্তাদের তৈরি করা যেকোন বিশ্বজগতের তুলনায় চক্রাধামের সৌন্দর্য্য অতুলনীয়। 

সৃষ্টিকর্তাদের সৃষ্ট বিশ্বজগত কারিগরিভাবে যতই নিখুঁত হোক না কেন, কল্পনাশক্তির অভাবে তা চক্রাধামের দৃশ্যপটের কাছে তা খুবই মামুলি মনে হবে।

যেমন ধরা যাক, চক্রাধামের আকাশে যে সূর্যের দেখা মেলে, সেটা আসলে একটা উপগ্রহ মাত্র। মাটি থেকে তার উচ্চতাও বেশি নয়, ডাংগুলি খেলায় জোরে মারলে পরে সেই পিচ্চি সূর্যে গিয়েও পড়তে পারে। যে সুপ্রাচীন কাছিমের পিছে চক্রাধাম বসানো, তার তুলনায় অবশ্য সবকিছুকেই পিচ্চি মনে হয়।  উল্কাঘাত জর্জরিত খোলস নিয়ে মহান আ'তুইন নামের সেই কাছিম অনন্ত সময়ের পথে ধীর যাত্রা করে চলেছে। কখনো কখনো সে তার মহাদেশের সমান বিরাট মাথা বাড়িয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া ধুমকেতু খপ করে ধরার চেষ্টা করে।

চক্রাধামে বসবাসকারী অধিকাংশ চোখ আর ঘিলু মহান আ'তুইন এর মাহজাগতিক বিশালত্ব অনুধাবনই করতে পারে না, তাই তাদের চোখে চক্রাধামের সবচেয়ে মোহনীয় দৃশ্য হচ্ছে বেড়প্রপাত। চক্রের পরিধির সবটুকু জুড়ে যেখানে সাগর টগবগ করতে করতে মহাশূন্যে ধাবিত হচ্ছে। অথবা তার চেয়েও মোহনীয় হচ্ছে বেড়প্রপাতের উপরে কুয়াশা ঘেরা বাতাসে ভেসে ওঠা বেড়ধনু, আটটি রঙের জগত জোড়া রঙধনু। অষ্টম রঙটি হচ্ছে অক্টারিন, অত্যন্ত শক্তিশালী জাদুর বলয়ের উপর সূর্যরশ্মি প্রতিসরিত হলে পরেই কেবল যা দেখা সম্ভব হয়।

কিংবা হতেও পারে, সবচেয়ে আকর্ষনীয় হচ্ছে চক্রের  কেন্দ্র, যেখানে সবুজ বরফে ছাওয়া দশ মাইল উঁচু এক খাড়া পর্বত মেঘের উপরে মাথা তুলে রয়েছে। যার মাথায় অবস্থিত ধম্মোকম্মোসারা রাজ্যে চক্রাধামের দেবতারা বাস করেন। তাদের পায়ের নিচে বিস্তৃত জৌলুসময় এক জগত থাকা সত্তেও চক্রাধামের দেবতারা কখনোই সন্তুষ্ট নন। অসম্ভবেরও একটা সীমা থাকে, চক্রাধাম সেই সীমার প্রান্তে অবস্থান করার কারণেই কেবল তারা দেবত্বলাভ করায় তারা কিঞ্চিত বিব্রত থাকেন, বিশেষ করে যখন অন্য সকল জগতের সৃষ্টিকর্তাদের কারিগরি দক্ষতার পাশে নিজেদের শিশুসুলভ কল্পনাশক্তির তুলনা করেন। এজন্যই হয়ত সর্বজ্ঞানী হওয়ার চেষ্টার পরিবর্তে নিজেদের মাঝে ঝগড়াঝাঁটি নিয়ে চক্রদেবতারা বেশি ব্যস্ত থাকেন।

কোন এক বিশেষ দিনে,আইও, অন্ধ হলেও যে সদা সতর্ক এবং ফলশ্রুতিতে প্রধান দেবতার পদাধিকারী, গালে হাত দিয়ে বসে সামনের লাল মার্বেল পাথরের টেবিলের উপরের সাজানো খেলার ছকের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। যেখানে চক্ষুকোটর থাকার কথা, সেখানে কেবল দু টুকরো চামড়া থাকার ফলে অন্ধ আইওর এই নামকরণ। তার কার্যকরী চোখের সংখ্যা যদিও অগণিত, এবং তারা শরীর থেকে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে, যেমন সেই মূহুর্তে কয়েকটি চোখ টেবিলের উপর ভেসে বেড়াচ্ছিলো।

খেলার ছকটি আসলে চক্রাধামেরই একটি নিখঁত মানচিত্র, যার উপর চৌকো ঘর কাটা। কোন কোন ঘর নিখঁতভাবে গড়া কিছু খেলার গুটি এ মূহুর্তে দখল করে আছে। কোন সাধারণ মানুষ উঁকি দিলে হয়ত সেসব গুটির মাঝে ব্রাভদ আর উইজেল নামের দুটো চরিত্রকে চিনতে পারতো। অন্যান্য গুটিগুলোও চক্রাধামের নানান বীরপুরুষ আর মল্লযোদ্ধার আদলে তৈরি, চক্রাধামে এমন চরিত্রের অভাব নেই।

খেলাতে এখনো টিকে আছে আইও, কুমীর দেবতা অফলার, ঝিরিঝিরি বাতাসের দেবতা জেফাইরাস, ভাগ্য আর দেবী। দুর্বল খেলোয়াড়রা বাদ পড়ার পর খেলার ছকের দিকে এখন সবার পূর্ণ মনোযোগ। সুযোগ খেলার প্রথমভাগেই বাদ পড়েছে, তার বীরপুরুষ গুটি সোজা এক দঙ্গল সশস্ত্র দানবীয় বামনের মাঝে ঢুকে অক্কা পেয়েছে। তার কিছুক্ষণ বাদেই নিশুতি খেলা থেকে তার বাজি উঠিয়ে নিয়েছে নিয়তির সাথে দেখা করবার অজুহাতে। আরও কিছু গুরুত্বহীন দেব দেবীরা খেলা বাদ দিয়ে এখন মূল খেলোয়াড়দের পিঠের উপর দিয়ে উঁকিঝুকি মারছে আর ফোড়ন কাটছে। কেউ কেউ বাজি ধরছে, পরের ধাপে দেবীর খেলা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনার উপর। দেবীর সর্বশেষ মল্লযোদ্ধা এখন আঁখ-মরপর্ক এর ধ্বংসস্তূপে এক চিমটি ছাই মাত্র, দ্বিতীয় কোন গুটিও নেই তেমন যেটা দিয়ে ভালো কোন চাল দেয়া সম্ভব।

অন্ধ আইও ছক্কার পাত্র হাতে নিলো। ছক্কার পাত্রটি একটি মাথার খুলি বিশেষ, যারা নানান ছিদ্রগুলি রক্তলাল চুনি পাথর দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। ভাসমান চোখ ক'টি দেবীর দিকে নিবিষ্ট করে আইও চাল দিলো।  তিনটি পাঁচ।

দেবীর চোখেএকটুখানি হাসির রেশ দেখা দিলো। তার চোখগুলোই এমন, উজ্জ্বল সবুজ, মণি বিহীন, যেন ভিতর থেকে কিছু জ্বলছে। চারদিকের শুনশান নীরবতার মাঝে সে তার গুটির বাক্স হাতড়ে এক জোড়া গুটি বের করে শব্দ করে খেলার ছকের উপর নামিয়ে রাখলো। বাকি খেলোয়াড়রা , এক সাথে গলা বাড়িয়ে দিলো গুটিগুলোকে দেখতে।

"এক নাচতেক সাদুকর আর এক  খেরানি"  শুঁড়ের জন্য কুমীরদেবতা অফলারের কথা সবসময় জড়িয়ে যায়, "বালো বাঁলো!" একটা দাঁড়া দিয়ে স্তূপ করা সাদা মুদ্রাগুলো সে টেবিলের মাঝখানে বাজির পাল্লায় ঠেলে দিলো। দেবী মাথা ঝুঁকিয়ে ছক্কার পাত্র হাতে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তার স্থির হাতে ছক্কা নড়বার শব্দে দেবতার যখন অধীর তখন সে টেবিলের উপর দিয়ে গড়িয়ে দিলো ছক্কা তিনটে।

একটা ছয়, একটা তিন আর একটা পাঁচ।

কিন্তু, কিন্তু, পাঁচটা যেন নড়ছে। কোটি কোটি অণু পরমাণুর ধাক্কাধাক্কিতে একসময় ছককাটা উলটে যেতে বাধ্য হলো। আস্তে করে ঘুরে সেটা হয়ে গেলো একটা সাত।

অন্ধ আইও ছক্কাটা তুলে গুনে দেখলো এর কয়টা দিক। তারপর বিব্রতভাবে বললো, "এই! চোট্টামি করে না।"