মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

পূর্বরঙ্গঃ

অসীম দূরের এক অনির্ণেয় মাত্রায় অবস্থিত কোন এক নক্ষত্রমন্ডল, যার অস্তিত্বই থাকার কথা ছিলো না, সেখানে বিলীয়মান তারারা ঘুরতে ঘুরতে দূরে সরে গেলে দেখা যায়,

ঐ আসছে,

 মহাজাগতিক স্রোতে ধীরে সাঁতার কেটে এগিয়ে চলে আ'তুইন, মহান কচ্ছপ। তার ভারী, শ্লথ পা গুলোর উপরে হাইড্রোজেনের বিন্দু জমে থাকে। সুপ্রাচীন খোলসের গায়ে অজস্র ধুমকেতুর আছড়ে পড়ার চিহ্ন। সাগরের সমান বিশাল চোখের কোণে গ্রহাণুকণা আর নেত্রমল জমে স্ফটিক এর মতন দৃষ্টি মেলে সে চেয়ে থাকে তার গন্তব্যের দিকে।

একটা শহরের চেয়েও বিশাল তার মস্তিষ্ক, গঠনগতভাবেই একটু ঢিলা, কেবলই ভাবতে থাকে তার পিঠে বয়ে চলা অসম্ভব ভার এর কথা।

যদিও মোট ভারের বেশিরভাগটাই হচ্ছে বেরিলিয়া, টুবুল, বিরাট ট'ফোন আর জেরাকিন নামের চার দানবীয় হাতির ওজন। ওদের তারকালোকিত চওড়া কাধের উপরেই কিনা এ জগতের চাকতিখানা বসানো। সে চাকতির পরিধি ঘিরে রয়েছে দীর্ঘ জলপ্রপাত আর ঢাকনি হয়ে রয়েছে অভ্রনীল রঙের স্বর্গ।

নভোমনোবিদ্যা অবস্য এখনো ঠিক নির্ধারিত করতে পারেনি এই দানবীয় হাতিরা কি নিয়ে চিন্তা করে।  এই তো, এই যে মহান কচ্ছপ সেটাও তো সেদিন অবধি কেবল অনুমানই ছিলো, যদি না ক্রাল নামের একটা ক্ষুদ্র ও গোপন রাজ্য, যেখানে পর্বতের ছায়া পরিধি-প্রপাত ছাড়িয়ে যায়, একটা লম্বা আড়া আর কপিকল সবচেয়ে দুরারোহ পাহাড়ের মাথায় বসিয়ে কিছু পর্যবেক্ষককে একটা পিতলের জলযানে ঢুকিয়ে দড়ি বেধে  কিনারা বরাবর প্রপাতের ধোয়াশার মধ্যে নামিয়ে দিত।

প্রাচীন নভোজীববিদরা, যাদেরকে এক ঝুলন্ত অভিযান থেকে বিশাল দাসবাহিনী দিয়ে টেনে উদ্ধার করতে হয়েছিল, যদিও মহান আ'তুইন এবং হাতিদের আকার আকৃতি অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তাতে এই ব্রহ্মান্ডের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য বিষয়ক মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোন উত্তর মেলেনি।

যেমন ধরা যাক, আ'তুইনের লিঙ্গ কি? বিজ্ঞ নভোঃজীববিদেরা মনে করেন যতদিন না একটা মহাশূন্যযান এবং তা ঝুলাবার জন্য আরো বিশাল এবং শক্তিশালী একখানা কপিকল বানানো হচ্ছে, এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। ততদিন অবধি তারা মহাবিশ্বের যতটুকু দেখতে পেয়েছেন তা নিয়েই জল্পনা কল্পনা করে কাটাতে হবে।

একটা প্রচলিত মতবাদ হচ্ছে যে আ'তুইন অশেষ থেকে এসেছে, এবং এভাবেই অবিচল গতিতে হামা  দিতে দিতে অশেষ এর দিকে চলতে থাকবে অনিঃশেষ সময় অবধি। বিশেষভাবে তাত্ত্বিকদের কাছে তো এ মতবাদ খুবই জনপ্রিয়।

ধার্মিক গোষ্ঠির কাছে অবশ্য বিকল্প একটি মতবাদ অধিক প্রিয়, যেটিতে বলা হয় আ'তুইন জন্মস্থান থেকে যাত্রা শুরু করে হামা দিয়ে চলেছে তার মিলন হবার স্থান ও মূহুর্তের উদ্দেশ্যে, যেমনটি চলছে মহাকাশের আর সকল তারা, যার যার নিজস্ব দানব কচ্ছপের পিঠে করে। যখন তাদের দেখা হবে, তারা প্রথম এবং শেষবারের অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী ও আবেগঘন এক মিলনে লিপ্ত হবে। এই অগ্নিগর্ভ মিলন থেকে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হবে নতুন সব কচ্ছপের এবং তারা নতুন ধরনের জগত তাদের পিঠে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করবে। এই মতবাদটি মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং মতবাদ হিসেবে পরিচিত।

আর এজন্যই, এই মতবাদের অনুসারী  'অবিচল গতি' চক্রের জনৈক জ্যোতিষকূর্মবিদের নতুন দূরবীক্ষণ যন্ত্রে প্রথম ধরা পড়লো যে জগতের সবচেয়ে প্রাচীন শহর থেকে চাকতির কেন্দ্রমুখী ধোঁয়ার কুন্ডলি উঠছে। কিন্তু সে মূহুর্তে সে ব্যস্ত ছিলো মহান আ'তুইনের ডান চোখের প্রতিফলিত বিচ্ছুরণাংক নির্ণয় করতে। যদিও সে রাতে তার গবেষণায় এতই নিমগ্ন হয়ে গিয়েছিলো যে ধোঁয়ার ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিলো। সে যাই হোক, সেই ছিলো ঘটনার প্রথম দর্শক।

এছাড়াও ছিলো আরও কয়েকজন দর্শক...